-
... প্রথম অফার লেটার পেতে না পেতেই পুরো ফ্যামিলি নিয়ে ভয়াবহ ভাইরাস জ্বরে পড়লাম। ঘরের যত কম্বল আছে সবকিছু জড়িয়ে নিজেকে মমি বানিয়ে রাখলাম। ভিসা ও এম্ব্যাসির প্রসিডিউর নিয়ে খুব ভাল নলেজ ছিল না, মাগদেবুর্গের ঐ কোর্সটা আমার প্রথম পছন্দ ছিল না। তাই দশদিন পর, সুস্থ হয়ে বুঝতে পারছিলাম না কবে এম্ব্যাসির এপয়েন্টমেন্ট নেয়া ঠিক হবে, কারণ অন্য ভার্সিটগুলো এখনো তাদের ডিসিশন জানায়নি। টিইউ কেমনিটৎস থেকে ত সরাসরি বলাই ছিল, স্টেটাস জানার জন্য কোন ইমেইল পাঠানো যাবে না। বাকি ভার্সিটিগুলোতে ইমেইল করেও কিছু জানা গেল না। এর মধ্যে হঠাৎ বিসাগের গ্রুপে পোস্ট পড়া শুরু হল যে এম্ব্যাসির সব এপয়েন্টমেন্টগুলো মার্চ পর্যন্ত ফুল-বুকড!
দুইদিন আগেও আমি জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত স্লট খালি দেখেছি। কিভাবে একদিনের মধ্যে সব বুকড হয়ে যায়! বাংলাদেশের কয় হাজার স্টুডেন্ট জার্মানির অফার লেটার পায়! - মাথায় ছোটখাট আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। এডমিশন পেয়েও কি তাহলে যেতে পারব না!
জার্মান এম্বাসির ভিসা এপোয়েন্টমেন্ট বুকিং সিস্টেমটা দুইন্যার সবচে ফালতু সিস্টেম। এপোয়েন্টমেন্ট নিতে অফার লেটার-মেটার কিচ্ছু লাগেনা, শুধু একটা পাসপোর্ট নম্বর আর ইমেইল এড্রেস থাকলেই হয়। এর সুযোগ নিয়ে এজেন্সিগুলা গণহারে স্লট বুক করে রাখসে বলে সন্দেহ হল! গ্রুপে পোস্ট করে জানা গেল শেষমেশ অফার লেটার না পেলে অনেকেই নিশ্চয় মানবিক কারণে বুকিং ক্যান্সেল করে দিবে অথবা এম্ব্যাসি আরও স্লট বাড়াবে। তাদের কথা মত, সারাদিন এম্ব্যাসির ওয়েবসাইটে সময়-ক্ষেপণ করতে লাগলাম। কয়েকদিন পর, হঠাৎ করে হঠাৎ করে এপ্রিল মাসের স্লট ছাড়া হল। চোখের পলকে সব বুক হয়ে গেল, ডেট পেলাম না। এভাবে কিছু দিন চলার পর মার্চের ১৪ তারিখে একটা স্লট নিতে পারলাম। আবার একদিন ফেব্রুয়ারি মাসের একটা ডেট চোখে পড়তে আগেরটা ক্যান্সেল করে নতুন না নিতে গিয়ে দুইটাই হারালাম। মার্চের ২৩ তারিখ খালি ছিল, সেটা বুক করে এম্ব্যাসির কন্টাক্ট ফর্ম পূরণ করে খুব সুন্দরভাবে তাদেরকে ফেব্রুয়ারির ১০ থেকে ২৫ তারিখের মধ্যে একটা ডেট দিতে ইমেইলে অনুরোধ করলাম। তিন-চারদিন পর এম্ব্যাসি আমাকে ১৪ ফেব্রুয়ারির ডেট দিল এবং বুঝলাম এটাই ট্রু লাভ!
এসব নাটকীয়তার মধ্যে আরও তিনটা কোর্সের অফার লেটার পেলাম, সাথে বাকিগুলা থেকে নিয়মিত বিরতিতে প্রত্যাখ্যানপত্র পাচ্ছি। সব মিলিয়ে টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি কেমনিৎসে যাব বলে মনস্থির করলাম। কোর্সটা ভাল, আমার পছন্দের, প্রফেসর ও অন্য অফিসিয়ালরাও অনেক আন্তরিক। তারপর ভিসা ইন্টার্ভিউর প্রস্তুতি হিসেবে,
- এম্ব্যাসির দেয়া চেকলিস্ট ফলো করে সব ডকুমেন্টস রেডি করলাম।
- স্টুডিওতে গিয়ে ভদ্রমার্কা ছবি তুলে নিলাম।
- ডয়চে ব্যাঙ্কে ব্লক একাউন্ট করে নিলাম।
- গ্রিন ডেল্টায় ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স করে নিলাম।
- ঢাকা ব্যাঙ্কে স্টুডেন্ট প্রোফাইল খুলে ব্লকে টাকা সেন্ড করলাম।
- স্টুডেন্টেনভের্কের মাধ্যমে ডর্মে রুমের জন্য আবেদন করলাম।
- বুকিং ডট কমে গিয়ে ১০ দিনের জন্য ফ্রি ক্যান্সেলের হোটেল-রুম বুক দিলাম।
- ভিসা এপ্লিকেশন ফর্ম পূরণ করলাম।
- মাস্টার্সের কোর্সটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলাম, শহর সম্বন্ধে ধারণা নিলাম।
- নিয়মতভাবে ব্যাচেলরের পড়াশুনা একটু রিভাইস দিয়ে নিলাম।
প্রত্যেকটি ধাপে বিসাগে প্রশ্ন করেছি, সাহায্য নিয়েছি এবং ঠিক সময়েই শেষ করেছি। শুধু ব্লকে টাকা ট্রান্সফারের কনফার্মেশন পেতে দেরি হয়েছিল, যেটা ইন্টার্ভিউর ৩ দিন পর মিসিং ডকুমেন্ট হিসেবে জমা দিয়েছি!
(চলবে)
পোভার্টি টেলস | স্বপ্নযাত্রা (প্রথম কিস্তি)
-
... যখনই জীবনে ব্যার্থতা আসে তখনই কেন যেন আপনজনেরা প্রতিবেশী, আত্মীয় ও কলিগের সোনার ছেলেদের বিশ্বজয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে আমাকে অপদস্থ করেন। সতেরো সালের উইন্টার সেমিস্টারে করা সকল আবেদনে রিজেক্টেড হওয়ার পর সময় আমার এমনি চলছিল। রিজেকশন লেটার পাওয়ার অনেক কারণ ছিল যেমন - সঠিকভাবে কোর্স বাছাই না করা, আবেদনে ভুলভ্রান্তি, পর্যাপ্ত এবং সঠিক তথ্য না জানা, অন্য মানুষের দেয়া তথ্য গস্পেল হিসেবে মেনে নেয়া, ফলস কনফিডেন্সের কারণে মাত্র তিনটা কোর্সে আবেদন করা, যথেষ্ট প্রিপারেশন না থাকাসহ ৮ ঘণ্টার জবের জন্য ৪ ঘণ্টা বাসে বসে থাকা ত আছেই! ফলে সদ্য পাশ করে ভাল জব করার পরেও প্রচণ্ড অস্তিত্বসঙ্কটে ভুগছিলাম!
বাবা সরকারী কর্মকর্তা এবং ব্রাজিলের সমর্থক। আমার বেসরকারি জবে থাকা এমনিতেও ওনার পছন্দ ছিল না। এইবার একদম পেয়ে বসলেন। হাইকোর্ট থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হল - ধুম্রপান ত্যাগ করা হবে এই শর্তে আরো ছয় মাস দেয়া হবে। এর মধ্যে কোন কিছু কনফার্ম না হলে সরকারী সার্কুলারগুলায় সিরিয়াসলি চেষ্টা করতে হবে। আর সবচে ভাল হয় যদি উচ্চশিক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে নিম্নমাধ্যমিক শ্রেণীর গনিতবই, সাধারণে জানে না এমন সাধারণ জ্ঞান আর গোপালগঞ্জের ভূগোল গলাধঃকরণ করে বিসিএস দিয়ে দেই। দেশে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা এতই চমৎকার যে শুধু প্রশাসনের লোক হলেই আমি নিজেকে প্রশাসনের হাত থেকে নিরাপদ রাখতে পারব - নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করা হল। কিন্তু এসব কথাবার্তায় আমি খুব একটা প্রভাবিত হলাম না। বুঝে গেলাম, দেয়ালে পিঠ থেকে গেছে তাই পিঠ দিয়েই দেয়াল ভাঙ্গার চেষ্টা করতে হবে! জব থেকে সন্ন্যাস নিয়ে সামার (২০১৮) সেমিস্টারের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা শুরু করলাম (ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হবে)।
সামারে আবেদন করার সুযোগ কম, বেশিরভাগ কোর্স উইন্টারে শুরু হয়। ডাডের পোর্টাল থেকে গুনেগুনে ১১টা কোর্স শর্টলিস্ট করলাম, এর মধ্যে ৫টা কোর্স খুবই পছন্দ হল। গণহারে সব ভার্সিটিতে ইমেইল করে জানিয়ে দিলাম, আমি ইখতিয়ার বিন বখতিয়ার খিলজি - কত লক্ষণ সেন আমার ভয়ে লাঞ্চ করা ভুলে যায়! - এখন তোমার ভার্সিটির ঐ কোর্সে আমার নজর, হাহা! নিজের পরিচয় ও একাডেমিক প্রোফাইল শেয়ার করে সুন্দর ও মার্জিতভাবে কোর্স রিলেটেড দুয়েকটা প্রশ্ন করে নিজের আগ্রহের জানান দিলাম। কিছু ভার্সিটি থেকে রবোটিক রিপ্লাই আবার কয়েকটি থেকে প্রফেসরের ব্যক্তিগত ইমেইলও পেলাম। প্রফেসররা কোর্সের মড্যুল ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্কসসহ কি কি টপিকসে তারা রিসার্চ করছেন তা সংক্ষেপে জানালেন এবং আবেদন করতে বললেন। দুইটা রিকোমন্ডেশন লেটারের জন্য ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র প্রফেসরদের হাসির খোরাক হওয়া আমি ভিনদেশী প্রফেসরদের একটু দয়াদৃষ্টিতেও দারুনভাবে অনুপ্রাণিত হলাম। সম্পূর্ণ ব্যাপারটাকে একটা পজিটিভ ভাইভ হিসেবে গ্রহণ করে আবেদন করা শুরু করলাম।
উইন্টারে ব্যার্থ হওয়ার মূল কারণই ছিল সঠিক প্ল্যান না থাকা। ইউনি-এসিস্টের পুরো প্রক্রিয়াটা খুব ঝামেলা মনে হওয়ায় সেবারে ইউনি-এসিস্টের মাধ্যমে কোন আবেদনই করিনি। এবার সে ভুল করলাম না, ইউটিউবে ইউনি-এসিস্টে আবেদন প্রক্রিয়ার অনেক ভিডিও দেখলাম, বিসাগের ব্লগ ও ট্যাগ অনুসারে গ্রুপের প্রায় সকল পোস্ট পড়লাম এবং সবচে যেটা গুরুত্বপূর্ণ ইউনি-এসিস্টের ওয়েবপেজে দেয়া গাইডলাইন ও ফ্যাক ভালভাবে পড়লাম। ডিরেক্ট এপ্লাইয়ের কোর্সগুলোর জন্য আলাদা ফাইলে সবকিছু গুছিয়ে আগেই রেখেছিলাম। ইউনি-এসিস্টের আবেদনগুলোতে বেশি সময় দিলাম এবং অনেককিছু নিয়ে ধারণা থাকা সত্ত্বেও নিজের আবেদনের সময় বেশ কিছু সমস্যার পড়েছিলাম যেখানে আমি বিসাগের সাহায্য নেই এবং প্রতিবারই ইউনিএসিস্টকে ইমেইল করি। এভাবে করে ডেডলাইনের অনেক আগেই পুরো আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করলাম।
আগেই জব ছেড়ে দেয়ায়, পুরদস্তুর বেকার মানুষ। দুটা ভার্সিটির ডিরেক্ট আবেদন দেরিতে ছিল, সেটা শেষ করতেই চরম দুশ্চিন্তা আর অলস ঘড়ির কাঁটা আঁকড়ে ধরল। কোথাও ভুল করলাম না তো! সাপ ছিল না লাঠি ছিল! - সাত পাঁচ চিন্তা মাথায় থাকায় অন্য কিছুতেই মন দিতে পারলাম না। ডিসেম্বরে ইউনি-এসিস্ট মেইল করে জানিয়ে দিল ফ্লেনসবুর্গের উইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে করা আমার আবেদন তারা ফরোয়ার্ড করছে না, কারণ আমার চার বছরের ব্যাচেলর নাকি জার্মানির তিন বছরের সমতুল্য। গাঁইগুই করেও কোন লাভ হলো না। এদিকে ভিপিডি থাকা সত্ত্বেও ইঙ্গোলস্টাটে এপ্লাই করতে পারি নি। দেয়ালে চির ধরার আগেই পিঠই ভেঙ্গে যাচ্ছে, এমন অবস্থা!
... অবশেষে অপয়া ঐ বছর শেষ হল। ২০১৮ সাল, প্রথম সুখবর পেলাম জানুয়ারির ৪ তারিখে। স্কুলে থাকতে বায়ুচাপ নিয়ে উদ্ভট এক এক্সপেরিমেন্টের কথা পড়েছিলাম। সেই বিজ্ঞানীর নামে এই ভার্সিটি, মাগদেবুর্গের অটো-ফন-গেরিক ইউনিভার্সিটি!
(চলবে)